ভারতের এই ১০ মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ! কিন্তু কেন? বিস্তারিত জানুন…

নারী ও পুরুষ দুইই ঈশ্বরের সৃষ্টি। আজকের বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে যেখানে নারী পুরুষের বাহ্যিক গঠনের খুব কম অংশেই সাদৃশ্য দেখা যায় না এবং সামান্য কিছু আভ্যন্তরীণ দৈহিক বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তা ছাড়া নারী পুরুষের মধ্যে বিশেষ কিছু পার্থক্য নেই।

তবুও পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীকে দেওয়া হয় না স্বাধীনতার অধিকার।

আজও তার পায়ে লাগানো আছে নিয়মের বেশ কিছু বেড়ি যার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয় তার বিচরণের ক্ষেত্রকে।

যে নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রাকৃতিক ক্ষমতা নিয়ে এসেছে এই পৃথিবীর বুকে তাকেই আমরা আজও মুক্তি দিতে পারি নি।আজও আমরা নারীদের কেন সমতুল্য ভাবতে পারি না, তা আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে।

সম্প্রতি শবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ নিয়ে যে শতাব্দী প্রাচীন যে নিয়ম বলবৎ ছিল তা ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালত অগ্রাহ্য করে দিয়েছে।বিচারকরা রায় দিয়ে জানিয়েছে ১০-৫০ বছরের মেয়েদের জন্য যে মন্দিরের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল তা ছিল অসাংবিধানিক।

এখানে নারীর অধিকারের খন্ডন করা হয়েছে।তাই এই নিয়ম চলতে পারে না এবং মন্দিরে সবার অবাধ প্রবেশাধিকার থাকবে।

এই ক্ষেত্রে হয়তো আদালতের দরজায় অপেক্ষা করার ফলে আমরা ফল পেলাম নতুন কিছু কিন্তু সমাজের উন্নতির বা বিবর্তনের সাথে সাথে আমরা এখনও আমাদের ভাবনা চিন্তার পরিবর্তন করি নি।

তাই আজও আমাদের ভারতের বুকেই দেখতে পায় এমন কিছু ধর্মীয় জায়গা যেখানে নারীদের প্রবেশ এখনও নিষিদ্ধ।

আজকের প্রতিবেদনে আমরা চাইবো এইসব জায়গার কথা আপনারা জানুন এবং নারীরাও যেন এইসব জায়গার প্রবেশের অধিকার পায় তার জন্য উপযুক্ত আইনি লড়াইয়ের জন্য সামনে এগিয়ে আসুন।

ভারতের এইসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে বর্তমানেও আছে…

নিজামুদ্দিন দরগা, দিল্লী

নিজামুদ্দিন দরগার একটি বিশেষ কক্ষে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা আছে।

কথিত আছে এই বিশেষ কক্ষে যেখানে সুফি থাকতেন এবং তাকে কবরস্থ করা হয়েছিল সেই কক্ষে আজও মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

google

আমাদের বিশ্বাস নারী, পুরুষ উভয়েই সমান ক্ষমতার অধিকারী। কোন প্রকার অধিকারের বৈষম্য তাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।

তাই আগামী দিনে যেসব মন্দির বা মসজিদ বা অন্য ধর্মীয় স্থানে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হিসাবে আছে তা আর থাকবে না বলেই দৃঢ় বিশ্বাস।

হাজী আলী দরগা, মুম্বাই

মুম্বাইয়ের এই দরগার ভেতরে মেয়েরা প্রবেশ করতে পারে না।

মেয়েরা বাইরে থেকেই এই দরগার সামনে উপস্থিত হতে পারে। কিন্তু ভেতরে ঢোকার একপ্রকার অদৃশ্য বাধা আছে।

google

জামা মসজিদ, দিল্লী

দিল্লির এই জনপ্রিয় মসজিদে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ বলেই অঘোষিত প্রথা চালু আছে।বলা হয় যে সন্ধ্যার নামাজের পর এই মসজিদে মহিলারা প্রবেশ করে না।

google

কার্তিকেয় মন্দির, পুস্কর, রাজস্থান

এই মন্দিরে প্রবেশ করলে মেয়েরা অভিশপ্ত হবে বলে একটা জনমত আছে।আর তাই এই মন্দিরে মেয়েরা সাধারণত প্রবেশ করতে চাই না।

google

শনি শৃঙ্গারপুর মন্দির,মহারাষ্ট্র

মহারাষ্ট্রের এই মন্দিরে গত ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।শুধুমাত্র পুরুষ পুণ্যার্থী এবং ভক্তদের মন্দিরে প্রবেশ করতে অনুমতি দেওয়া হতো।

পরে ধর্মপ্রান মহিলারা এই প্রাচীন রীতির বা নিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন এবং আদালতে যান ।আদালত পরবর্তী সময়ে রায় দেয় মহিলাদের পক্ষে।

মন্দির কতৃপক্ষ জানান তারা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ করতে দেবেন।

সেইমতো ৯ই এপ্রিল ২০১৬ সালে দুই মহিলা প্রিয়াঙ্কা জাগতপ এবং পুস্পক কেবাদকার এই দুই মহিলা প্রথমবার মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে শনি বিগ্রহে পূজা দেন।

google

পাটবাউসি, আসাম

আসামের এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা হলেন বিভিন্ন বৈষ্ণব গুরু যেমন শ্রীমন্ত শঙ্করদেব, শ্রী মাধবদেব, শ্রী দামোদর দেব প্রমুখ।

পবিত্রতা রক্ষার জন্য মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।ঋতুবতী মহিলারা এই মন্দিরে প্রবেশ করলে মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট হবে বলে মত দেওয়া হয়েছিল মন্দির কতৃপক্ষ থেকে।

এই নিয়ম নাকি গত ৫০০ বছর ধরে মানা হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছিল।

যদিও পরবর্তী সময়ে ২০১০সালে আসামের রাজ্যপাল জে বি পাটনায়ক এই রীতির বিরোধিতা করে তার সাথে ২০ জন মহিলা নিয়ে গিয়ে মন্দিরের প্রাচীন রীতি ভেঙে দেন।কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার আগের নিয়ম বলবৎ হয়ে যায়।

google

জৈন মন্দির, গুনা, মধ্যপ্রদেশ

মধ্য প্রদেশের এই জৈন মন্দিরে মেয়েরা জিন্স বা কোন পশ্চিমি পোশাক পরে প্রবেশ নিষিদ্ধ।

এছাড়াও মহিলাদের সাজসজ্জা যেমন মেকআপ, লিপস্টিক ইত্যাদি প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহার করে মহিলাদের মন্দিরে প্রবেশও নিষিদ্ধ।

google

জৈন মন্দির, রনকপুর, রাজস্থান

রাজস্থানের ১৫ শতকে তৈরি হওয়া জৈনদের পাঁচটি প্রধান তীর্থস্থানের মধ্যে অন্যতম।

এই মন্দিরে ১৪৪৪ টির মতো সাদা এবং কারুকার্যখচিত স্তম্ভ দেখতে পাওয়া যায়।ঋতুবতী অবস্থায় মেয়েরা প্রবেশ করতে পারে না এই মন্দিরে।

এছাড়াও এই মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে চামড়ার তৈরি কোন সামগ্রী নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না।

এই জৈন মন্দিরে মেয়েরা পশ্চিমি পোশাক পরেও প্রবেশ করতে পারে না।হাঁটুর নীচে পোশাক পরেও প্রবেশ নিষিদ্ধ।

google

পদ্মনাভস্বামী মন্দির, কেরালা

ভারতের অন্যতম ধনী মন্দির।এই মন্দিরের গুপ্ত কক্ষে পাওয়া ধনের পরিমান ভারতের অন্যান্য যেকোন প্রসিদ্ধ মন্দিরের চেয়ে বহুগুণে বেশি।

কিন্তু এই মন্দিরের সঙ্গে আছে এক অদ্ভুত নিয়ম বা বর্তমানে যাকে আমরা বলে থাকি ট্যাবু।

এই মন্দিরে মহিলাদের পূজা করতে বাধা নেই।কিন্তু মন্দিরের গুপ্ত কক্ষ বা ভল্ট প্রবেশ মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ।

এমনকি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের এক মহিলা গবেষককে এই মন্দিরের গুপ্ত ধন কক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় নি গুপ্তকক্ষের পবিত্রতা নষ্ট করে।

google

আয়াপ্পন মন্দির (শবরীমালা মন্দির), কেরালা

এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা আয়াপ্পা।এই মন্দিরে ঋতুবতী মহিলা অর্থাৎ ১০থেকে ৫০ বছর বয়সী মহিলাদের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল।

শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের জন্য ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করা হয়।

সম্প্রতি শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরে যে নিয়ম ছিল তার বদল করতে রায় দিয়েছে পাঁচজন বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ।

আর এই রায়ের ফলে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নিয়ে আর কোন প্রাচীন নিয়ম বলবৎ থাকবে না এমনই মনে করা হচ্ছে।

google
Sanjib: